Dhaka , বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
News Title :
নীরব ঘাতক ফ্যাটি লিভার: সচেতনতা ও প্রতিরোধই হতে পারে বাঁচার উপায় অ্যান্টিভেনম সংকটে ঝিনাইদহে সাপে কাটা রোগীর মৃত্যু, চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ আইন হাতে তুলে নিতে পিছ পা হবো নাঃ মুন্নি সাহা যশোরে ১১ দলীয় জোটের সমাবেশ ও গণমিছিল: ‘গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের দাবি গোবিন্দগঞ্জে স্কুলে যাওয়ার পথে ছাত্রীকে তুলে নিয়ে দিনভর ধর্ষণ, রাস্তায় ফেলে পালাল দুর্বৃত্তরা যবিপ্রবি হলের খাবারে বিষক্রিয়া: কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার অভিযোগ ​ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা ও হামলার প্রতিবাদে যশোরে ছাত্রশিবিরের কর্মী সমাবেশ স্বাস্থ্যখাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে ‘শূন্য ব্যয়ে সংস্কার’ প্রস্তাব এমপি মোসলেহ উদ্দিন ফরিদের চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ: ছাত্রদলের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ, উত্তপ্ত ক্যাম্পাস “ইউরোপে নতুন গন্তব্য: সরকারি উদ্যোগে ৭ দেশে মিলছে কাজের সুযোগ”
একটি রাজনৈতিক সমীকরণ

মিডিয়া ইম্পেরিয়ালিজম এবং দলের আত্মঘাতী নীরবতা

রাজনীতিতে ‘পারসেপশন’ বা ধারণা তৈরি করাটাই যুদ্ধের অর্ধেক। আর আধুনিক রাজনীতিতে এই ধারণা তৈরির মূল কারিগর হলো মিডিয়া। কিন্তু যখন মূলধারার মিডিয়া তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের বদলে নির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নে লিপ্ত হয়, তখন তাকে আর সাংবাদিকতা বলা যায় না, বলতে হয় ‘মিডিয়া ইম্পেরিয়ালিজম’ বা সংবাদ সাম্রাজ্যবাদ। সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে মিডিয়া পাড়ায় যে নাটকীয়তা দেখা গেল, তা এই সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতারই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

ঘটনার সূত্রপাত সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ ইস্যুকে কেন্দ্র করে। জনাব সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট এবং পরিমিত। তিনি বলেছিলেন, “আমরা হতাশ; এটা নিয়ে আমরা আলোচনা করব।” অথচ দেশের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমগুলো সম্মিলিতভাবে একটি মিথ্যা ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি করল। হেডলাইন হলো—”বিএনপি না থাকলে ১১ দলীয় জোট শপথ নেবে না।”

এটি কেবল মিসকোট বা ভুল উদ্ধৃতি নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত ‘মিডিয়া ফ্রেমিং’। এই ফ্রেমিংয়ের মাধ্যমে তারা এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছে।

প্রথমত, তারা জামায়াতে ইসলামীকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যেন দলটির নিজস্ব কোনো মেরুদণ্ড বা সিদ্ধান্ত নেই, তারা বিএনপির সিদ্ধান্তের ওপর অন্ধভাবে নির্ভরশীল। দ্বিতীয়ত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—বিএনপির গণভোট বা আনুপাতিক নির্বাচনের দাবির প্রতি অনীহা বা সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে তাদের যে কৌশলী অবস্থান, সেটিকে আড়াল করা। মিডিয়া খুব চতুরতার সঙ্গে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু বিএনপির ‘গণভোট বিমুখতা’ থেকে সরিয়ে জামায়াতের তথাকথিত ‘শপথ বর্জন’-এর দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে।

এটাকে যদি আমরা ‘মিডিয়া সন্ত্রাস’ বলি, তবে অত্যুক্তি হবে না। কারণ, এই মিথ্যাচারের মাধ্যমে একটি দলকে জনবিচ্ছিন্ন করার এবং কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হয়েছে। সিভিল সোসাইটি বা সুশীল সমাজের কাছে বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে, জামায়াত সংস্কার চায় না, তারা কেবল জোটের রাজনীতি বোঝে। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠটি আরও বেদনাদায়ক। বহিরাগত মিডিয়া যখন আক্রমণ করে, তখন দলের নিজস্ব মিডিয়া উইং বা প্রচার বিভাগের কাজ হলো ঢাল হয়ে দাঁড়ানো এবং পাল্টা সত্য তুলে ধরা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, জামায়াতের মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বশীলদের ভূমিকা এক্ষেত্রে ছিল চরম হতাশাজনক।

যখন জাতীয় পর্যায়ের মিডিয়াগুলো ব্রেকিং নিউজের নামে অপপ্রচার চালাচ্ছিল, তখন দলের প্রচার বিভাগের দায়িত্বশীলরা—যাদের নাম হিসেবে জনাব জুবায়ের ও আকন্দ সাহেবের কথা উঠে আসে—তাঁরা কী করছিলেন? তাৎক্ষণিকভাবে এই মিথ্যার প্রতিবাদ জানানো, সঠিক ভিডিও ফুটেজসহ পাল্টা প্রেস রিলিজ দেওয়া, কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ন্যারেটিভ কাউন্টার করার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ কি আমরা দেখেছি? উত্তর—না।

মিডিয়া যুদ্ধের ময়দানে নীরবতা সম্মতির লক্ষণ হিসেবে গণ্য হয়। মিডিয়া উইংয়ের এই অযোগ্যতা ও নিষ্ক্রিয়তা দলকে বারবার জনমনে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাদের ব্যর্থতায় দল আজ ডিফেন্সিভ মোডে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, রাজনীতিতে ভ্যাকুয়াম বা শূন্যস্থান থাকে না। আপনি যদি আপনার সত্যটা না বলেন, তবে প্রতিপক্ষ তাদের মিথ্যা দিয়ে সেই স্থান দখল করে নেবে।

আজকের ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন মিসকোট নয়, এটি একটি ওয়েক-আপ কল। মিডিয়া তার স্বভাবজাত প্রবৃত্তি অনুযায়ী শক্তিশালীকে তোষণ করবে এবং সুবিধাজনক ন্যারেটিভ তৈরি করবে। কিন্তু সেই ন্যারেটিভ ভাঙার সক্ষমতা যদি দলের মিডিয়া উইংয়ের না থাকে, তবে রাজনৈতিকভাবে দলকে চড়া মূল্য দিতে হবে।

সময় এসেছে মিডিয়া ইম্পেরিয়ালিজমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার। কিন্তু তার আগে প্রয়োজন ঘরের ভেতর শুদ্ধি অভিযান। অযোগ্য নেতৃত্বের হাতে প্রচারের দায়িত্ব রেখে দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে মিডিয়ার সঙ্গে লড়াই করা আর ভাঙা তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া একই কথা।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

নীরব ঘাতক ফ্যাটি লিভার: সচেতনতা ও প্রতিরোধই হতে পারে বাঁচার উপায়

একটি রাজনৈতিক সমীকরণ

মিডিয়া ইম্পেরিয়ালিজম এবং দলের আত্মঘাতী নীরবতা

Update Time : ০৩:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

রাজনীতিতে ‘পারসেপশন’ বা ধারণা তৈরি করাটাই যুদ্ধের অর্ধেক। আর আধুনিক রাজনীতিতে এই ধারণা তৈরির মূল কারিগর হলো মিডিয়া। কিন্তু যখন মূলধারার মিডিয়া তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের বদলে নির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নে লিপ্ত হয়, তখন তাকে আর সাংবাদিকতা বলা যায় না, বলতে হয় ‘মিডিয়া ইম্পেরিয়ালিজম’ বা সংবাদ সাম্রাজ্যবাদ। সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে মিডিয়া পাড়ায় যে নাটকীয়তা দেখা গেল, তা এই সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতারই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

ঘটনার সূত্রপাত সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ ইস্যুকে কেন্দ্র করে। জনাব সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট এবং পরিমিত। তিনি বলেছিলেন, “আমরা হতাশ; এটা নিয়ে আমরা আলোচনা করব।” অথচ দেশের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমগুলো সম্মিলিতভাবে একটি মিথ্যা ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি করল। হেডলাইন হলো—”বিএনপি না থাকলে ১১ দলীয় জোট শপথ নেবে না।”

এটি কেবল মিসকোট বা ভুল উদ্ধৃতি নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত ‘মিডিয়া ফ্রেমিং’। এই ফ্রেমিংয়ের মাধ্যমে তারা এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছে।

প্রথমত, তারা জামায়াতে ইসলামীকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যেন দলটির নিজস্ব কোনো মেরুদণ্ড বা সিদ্ধান্ত নেই, তারা বিএনপির সিদ্ধান্তের ওপর অন্ধভাবে নির্ভরশীল। দ্বিতীয়ত, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—বিএনপির গণভোট বা আনুপাতিক নির্বাচনের দাবির প্রতি অনীহা বা সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে তাদের যে কৌশলী অবস্থান, সেটিকে আড়াল করা। মিডিয়া খুব চতুরতার সঙ্গে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু বিএনপির ‘গণভোট বিমুখতা’ থেকে সরিয়ে জামায়াতের তথাকথিত ‘শপথ বর্জন’-এর দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে।

এটাকে যদি আমরা ‘মিডিয়া সন্ত্রাস’ বলি, তবে অত্যুক্তি হবে না। কারণ, এই মিথ্যাচারের মাধ্যমে একটি দলকে জনবিচ্ছিন্ন করার এবং কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হয়েছে। সিভিল সোসাইটি বা সুশীল সমাজের কাছে বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে, জামায়াত সংস্কার চায় না, তারা কেবল জোটের রাজনীতি বোঝে। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠটি আরও বেদনাদায়ক। বহিরাগত মিডিয়া যখন আক্রমণ করে, তখন দলের নিজস্ব মিডিয়া উইং বা প্রচার বিভাগের কাজ হলো ঢাল হয়ে দাঁড়ানো এবং পাল্টা সত্য তুলে ধরা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, জামায়াতের মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বশীলদের ভূমিকা এক্ষেত্রে ছিল চরম হতাশাজনক।

যখন জাতীয় পর্যায়ের মিডিয়াগুলো ব্রেকিং নিউজের নামে অপপ্রচার চালাচ্ছিল, তখন দলের প্রচার বিভাগের দায়িত্বশীলরা—যাদের নাম হিসেবে জনাব জুবায়ের ও আকন্দ সাহেবের কথা উঠে আসে—তাঁরা কী করছিলেন? তাৎক্ষণিকভাবে এই মিথ্যার প্রতিবাদ জানানো, সঠিক ভিডিও ফুটেজসহ পাল্টা প্রেস রিলিজ দেওয়া, কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ন্যারেটিভ কাউন্টার করার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ কি আমরা দেখেছি? উত্তর—না।

মিডিয়া যুদ্ধের ময়দানে নীরবতা সম্মতির লক্ষণ হিসেবে গণ্য হয়। মিডিয়া উইংয়ের এই অযোগ্যতা ও নিষ্ক্রিয়তা দলকে বারবার জনমনে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাদের ব্যর্থতায় দল আজ ডিফেন্সিভ মোডে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, রাজনীতিতে ভ্যাকুয়াম বা শূন্যস্থান থাকে না। আপনি যদি আপনার সত্যটা না বলেন, তবে প্রতিপক্ষ তাদের মিথ্যা দিয়ে সেই স্থান দখল করে নেবে।

আজকের ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন মিসকোট নয়, এটি একটি ওয়েক-আপ কল। মিডিয়া তার স্বভাবজাত প্রবৃত্তি অনুযায়ী শক্তিশালীকে তোষণ করবে এবং সুবিধাজনক ন্যারেটিভ তৈরি করবে। কিন্তু সেই ন্যারেটিভ ভাঙার সক্ষমতা যদি দলের মিডিয়া উইংয়ের না থাকে, তবে রাজনৈতিকভাবে দলকে চড়া মূল্য দিতে হবে।

সময় এসেছে মিডিয়া ইম্পেরিয়ালিজমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার। কিন্তু তার আগে প্রয়োজন ঘরের ভেতর শুদ্ধি অভিযান। অযোগ্য নেতৃত্বের হাতে প্রচারের দায়িত্ব রেখে দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে মিডিয়ার সঙ্গে লড়াই করা আর ভাঙা তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া একই কথা।