সরকারি কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির দোহাই দিয়ে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ ও ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগে (আইএমইডি)। ‘ফলাফলভিত্তিক পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন পদ্ধতির কার্যকর ব্যবহারে আইএমইডির সক্ষমতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক একটি ছোট প্রকল্পকে ঘিরে এই বিলাসিতার আয়োজন চলছে। বারবার প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়িয়ে সরকারি কোষাগারের টাকা অপচয় করার এই উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
বিদেশ ভ্রমণে মাথাপিছু ব্যয় ৪ লাখ থেকে ১০ লাখ
প্রকল্পের মূল প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী, শুরুতে ৪০ জন কর্মকর্তার বিদেশ প্রশিক্ষণের জন্য ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল, যেখানে মাথাপিছু খরচ ধরা হয়েছিল ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। তবে দ্বিতীয় সংশোধনীতে (আরডিপিপি) প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৭০ জন করা হয়েছে এবং বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে ৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ, সংখ্যা দ্বিগুণ না বাড়লেও খরচ বেড়েছে প্রায় চার গুণ। নতুন প্রস্তাবে মাথাপিছু ব্যয় ধরা হয়েছে ১০ লাখ টাকা।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, বর্ধিত ৩০ জন কর্মকর্তার প্রত্যেকের পেছনে খরচ ধরা হয়েছে ১৭ লাখ টাকা করে। এছাড়া থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম বা মালয়েশিয়ার মতো দেশে ৭ দিনের প্রশিক্ষণের জন্য এই বিপুল ব্যয়কে ‘অস্বাভাবিক’ বলছেন খোদ আইএমইডির কর্মকর্তারা।
অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ও গাড়ি ভাড়াতেও লুটপাটের ইঙ্গিত
কেবল বিদেশ ভ্রমণ নয়, প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ খাতগুলোতেও ব্যয়ের লাগাম ছাড়া প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে:
-
অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ: আগে ৮২৫ জনের জন্য ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও, এখন ১ হাজার ৪৮৫ জনের জন্য চাওয়া হয়েছে ১১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। এতে মাথাপিছু খরচ ২৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৮ হাজার টাকায়।
-
গবেষণা খাত: একটি গবেষণার জন্য যেখানে ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল, এখন দুটি গবেষণার জন্য ২ কোটি ১০ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।
-
যানবাহন ভাড়া: গাড়ির সংখ্যা ৮টি থেকে কমিয়ে ৭টি করা হলেও ভাড়া বাবদ খরচ ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা বাড়িয়ে ১১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মাসিক জিপ ভাড়া ধরা হয়েছে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা, যা বর্তমান বাজারদরের তুলনায় অনেক বেশি।
প্রশ্নবিদ্ধ আইএমইডির নিজস্ব দক্ষতা
আইএমইডির কাজ হলো সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প মূল্যায়ন করা। কিন্তু নিজেদের একটি ছোট প্রকল্প (বর্তমানে প্রস্তাবিত ৪৪ কোটি টাকা) বাস্তবায়নে বারবার সংশোধন ও অদক্ষতার পরিচয় দেওয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মো. মামুন আল রশিদ এশিয়া পোস্টকে বলেন,
“যারা দেশের সব প্রকল্প মূল্যায়ন করবে, তারা নিজেরাই যদি এমন ছোট প্রকল্প বারবার সংশোধন করে, তবে তাদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। দুই-তিন বছরে বিদেশের খরচ এত বাড়েনি যে প্রাক্কলন এত ভুল হবে।”
কর্তৃপক্ষের সাফাই
অসঙ্গতির বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মোহম্মদ মিজানুর রহমান দাবি করেন, ইউরোপের দেশগুলোতে প্রশিক্ষণ সম্ভব না হওয়ায় এশীয় দেশগুলোর খরচ সমন্বয় করে নতুন প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে বর্ধিত জনবল ও অতিরিক্ত ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেননি।
সরকার যখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে মিতব্যয়িতার ডাক দিচ্ছে, তখন আইএমইডির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের এমন ‘ভ্রমণবিলাসী’ প্রকল্প সংশোধন প্রস্তাবকে নীতিবিবর্জিত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
© কপিরাইট: এশিয়া পোস্ট (Asia-Post)

খবরা-খবর স্পেশাল 









