তেলের ‘তেলেসমাতি’: পাম্পে হাহাকার, মন্ত্রীদের বয়ানে গোলকধাঁধা।
দেশের জ্বালানি তেলের বাজারে চলছে এক অদ্ভুত ‘তেলেসমাতি’। গত কয়েকদিন ধরে রাজধানীসহ সারাদেশের অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে ঝুলে আছে ‘তেল নেই’ লেখা বোর্ড। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ডিজেল বা অকটেন। সাধারণ মানুষ যখন এই সংকটে দিশেহারা, তখন নীতিনির্ধারক ও মন্ত্রীদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য জনমনে তৈরি করছে নতুন সংশয়। অনেকেই বর্তমান পরিস্থিতির সাথে বিগত আমলের সংকটের মিল খুঁজে পাচ্ছেন।
পাম্পে পাম্পে ‘নো স্টক’
সরেজমিনে দেশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ পাম্পের নজেলগুলো অলস পড়ে আছে। মোটরসাইকেল আরোহী থেকে শুরু করে গণপরিবহনের চালকরা এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ছুটছেন এক লিটার তেলের আশায়। যেখানে তেল মিলছে, সেখানে লাইনের দৈর্ঘ্য কয়েক কিলোমিটার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। পাম্প মালিকদের দাবি, ডিপো থেকে চাহিদামতো সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাম্প ব্যবস্থাপক বলেন, “আমাদের বলা হচ্ছে তেল আসবে, কিন্তু কখন আসবে তা কেউ জানি না।”
মন্ত্রীদের বক্তব্যে বিভ্রান্তি
সাধারণ মানুষের এই ভোগান্তির মাঝে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারি মহলের ভিন্ন ভিন্ন উক্তি।
-
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য: আমদানিতে কোনো সমস্যা নেই, পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। এটি কেবলই পরিবহনজনিত সমস্যা।
-
সড়ক ও পরিবহন মন্ত্রণালয়ের ভিন্ন সুর: পরিস্থিতি সামাল দিতে এক মাস গাড়ি ছাড়া চলার পরামর্শ দিয়ে সড়ক মন্ত্রী বলেছেন, “একটা মাস গাড়ি ছাড়া চলুন, হাঁটাচাঁটি করলে শরীর ভালো থাকে।”
-
জ্বালানি মন্ত্রীর প্রশ্ন: সরবরাহ স্বাভাবিক দাবি করে তিনি প্রশ্ন ছুড়েছেন, “তেলের অভাবে কারও গাড়ি কি বন্ধ হয়ে গেছে?”
মন্ত্রীদের এই খণ্ডিত, স্ববিরোধী এবং মাঝে মাঝে উপহাসমূলক বক্তব্য জনগণকে আশ্বস্ত করার বদলে আরও বেশি আতঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ করে তুলছে। সচেতন নাগরিক সমাজ বলছেন, সংকটের প্রকৃত কারণ আড়াল করে দায় এড়ানোর এই সংস্কৃতি বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলের সেই ‘সব ঠিক আছে’ তত্বের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
ভোগান্তির কবলে জনজীবন
তেলের সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে পরিবহন খাত। রাস্তায় গণপরিবহনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা। পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় নিত্যপণ্যের দাম আরও এক দফা বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
“পাম্পে আসলে বলে তেল নেই, অথচ মন্ত্রীরা বলছেন অভাব নেই। তাদের একেকজন একেক কথা বলছেন। আমরা কি আবার সেই পুরনো আমলের নাটকের পুনরাবৃত্তি দেখছি?” — ক্ষুব্ধ এক বাস চালক।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি দ্রুত স্বচ্ছতার সাথে তেলের সরবরাহের প্রকৃত চিত্র জনগণের সামনে তুলে না ধরে এবং সিন্ডিকেট দমনে কঠোর না হয়, তবে এই ‘তেলেসমাতি’ অচিরেই সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিতে পারে।

তবিবুর রহমান 








